এবিসি ন্যাশনাল নিউজ২৪ ইপেপার

স্বপ্নের ইটালি যেতে না পেরে নিঃস্ব হয়ে এখন অন্যের জমির শ্রমিক জাকারিয়া

মোঃ মাসুম হোসেন অন্তু, (সিরাজগঞ্জ) প্রতিনিধি:
  • আপডেট সময় : ০৪:২৯:৪০ অপরাহ্ন, রবিবার, ৩ ডিসেম্বর ২০২৩ ৩৪৪ বার পড়া হয়েছে

 

মোঃ মাসুম হোসেন অন্তু, (সিরাজগঞ্জ) প্রতিনিধি: প্রতিবেশীর কথায় অনুপ্রাণিত হয়ে নিজের ভাগ্য উন্নয়ন ও পরিবারের স্বচ্ছলতা ফেরাতে ইতালি যাওয়ার স্বপ্নে বিভোর হয়ে কিছু জমি বন্ধক রেখে জাকারিয়া ইসলাম নামের এক যুবক ৯ লাখ টাকা তুলে দেন দালালের হাতে।
কিন্তু বিধিবাম ইতালি যাওয়ার স্বপ্ন আর পুরন হয়নি জাকারিয়া নামের সেই যুবকের, ফলশ্রুতিতে পর্যায়ক্রমে প্রায় সাড়ে ১৪ লাখ টাকা ফুরিয়ে লিবিয়া থেকে নিঃস্ব হয়ে দেশে ফিরে অন্যের জমিতে শ্রমিক হিসেবে বর্তমানে কাজ করছেন তিনি।
ঘটনাটি ঘটেছে সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলার মোহনপুর ইউনিয়নের নাদা গ্রামে। জাকারিয়া ইসলাম ওই গ্রামের মো. ওবায়দুল হোসেন দুলালের ছেলে। এই ঘটনায় জাকারিয়া ইসলামের বাবা দুলাল হোসেন বাদী হয়ে গত ২রা জানুয়ারি সিরাজগঞ্জ মানব পাচার দমন বিশেষ ট্রাইব্যুনালে আব্দুল মজিদ তার স্ত্রী হাসি খাতুন ও ছোটভাই বাদশা কে আসামি করে মামলা দায়ের করেন।
এই মামলার ১নং আসামি আব্দুল মজিদ বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন, তার স্ত্রী জামিনে মুক্ত ও ভাই গ্রেফতারের ভয়ে পালিয়ে রয়েছেন।
শনিবার (২রা ডিসেম্বর) দুপুরে সরেজমিনে উল্লাপাড়া উপজেলার মোহনপুর ইউনিয়নের নাদা গ্রামে একটি কৃষি জমিতে গিয়ে দেখা যায় বেশ কয়েকজন শ্রমিকের সাথে জাকারিয়া ইসলাম একটি সরিষা ক্ষেতে কাজ করছেন।
পরে তার সাথে কথা হলে জাকারিয়া ইসলাম জানান, প্রতিবেশী মৃত ছালাম প্রামাণিকের ছেলে আব্দুল মজিদ আমাকে ইতালি নিয়ে যাওয়ার আশ্বাস দিলে পরিবারের সাথে আলোচনা করে জমি বন্ধক রেখে ৯ লাখ টাকা তার হাতে তুলে দেই। গত বছরের মে মাসে আমাকে ও আব্দুল মজিদের ছেলেকে লিবিয়া পাঠানো হয়। সেখানে আড়াই মাস থাকার পর সমুদ্রপথে ইতালি যাওয়ার সময় কোস্টগার্ড আমাদের আটক করে।
জাকারিয়া ইসলামের মা পিঞ্জিরা খাতুন অভিযোগ করে বলেন, এরপর জেল থেকে মুক্তির জন্য প্রায় ৬৫ হাজার টাকা প্রদান করা হয় আব্দুল মজিদকে। পরে জেল থেকে মুক্ত হলে লিবায়ার দালাল জাকারিয়াকে মাফিয়াদের হাতে বিক্রি করে দেওয়া হয়। মাফিয়ারা জাকারিয়ার পরিবারের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের জন্য তাকে অমানুষিক নির্যাতন করে বাড়িতে বাবা মায়ের কাছে কল দিয়ে কথা বলায়।
এর মধ্যে বেশ কিছুদিন জাকারিয়াকে মাফিয়ারা অনাহারে রাখে ও মারধর করে। পরে মাফিয়াদের হাত থেকে ছেলের মুক্তির জন্য ২ দফায় প্রায় সাড়ে ৯ লাখ টাকা পাঠানো হয়। এজন্য তাদের গরু, ট্রলার ও ৪০ শতাংশ জমি বিক্রি করতে হয়। অর্থ দিয়ে ছাড়া পেয়ে লিবিয়া গমনের ৯ মাস পর গত ১৬ই ফেব্রুয়ারি জাকারিয়া দেশে ফেরে।
এই বিষয়ে অভিযুক্ত আব্দুর মজিদের বাড়িতে গেলে তার ছোট ভাই বাদশার স্ত্রী সাংবাদিকদের জানান, জাকারিয়া ও আমার ভাসুরের ছেলে হাসান একসাথে লিবিয়া গিয়েছিল তারা আবার ফিরেও এসেছে। তবে আমার স্বামীর এই ঘটনার সাথে কোন সম্পর্ক নেই, তাকে উদ্যোশ্যমূলক ভাবে মামলার আসামি করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, তার স্বামী বাদশা একজন অসুস্থ্য মানুষ তার ওপেন হার্ট সার্জারি করা। মিথ্যা মামলায় গ্রেফতারের ভয়ে সে পালিয়ে রয়েছে এরকম চলতে থাকলে তার স্বাস্থ্যের আরও অবনতি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এই বিষয়ে জাকারিয়া ও আব্দুল মজিদের প্রতিবেশীরা জানান, আব্দুল মজিদ ইতিপূর্বেও আমাদের গ্রামের ৮/১০ জনকে এভাবেই ইতালি পাঠিয়েছেন। তার যদি অসৎ কোন উদ্যেশ্য থাকতো তাহলে জাকারিয়ার সাথে তার ছেলে হাসানকে পাঠাতেন না।
তারা আরও বলেন, মজিদের ভাই বাদশা অত্যন্ত ভালো প্রকৃতির একজন মানুষ। তিনি গ্রামেই মুদিখানার দোকান করেন, তাকে মিথ্যা ভাবে মামলায় জড়ানো হয়েছে।
এই বিষয়ে মুল অভিযুক্ত আব্দুল মজিদের ছোটভাই বাদশা বলেন, আমার ভাতিজা ও জাকারিয়ার লিবিয়া হয়ে ইতালি যাওয়ার জন্য তাদের উভয়ের পিতা উল্লাপাড়া ও ঢাকায় গিয়ে দালাল আজিজের মাধ্যমে একাউন্টে টাকা প্রদান করে। লিবিয়া গিয়ে তারা তারা দু্জনই মাফিয়াদের হাতে আটক হয়, এসময় মুক্তিপন হিসেবে আমার ভাই ও জাকারিয়ার বাবা ওবায়দুল মাফিয়াদের দেওয়া একাউন্টে আবারও টাকা দেয়।
গত ১৬ই ফেব্রুয়ারি জাকারিয়া দেশে ফেরে ৫মাস পর মাফিয়াদের হাত থেকে মুক্তি পেয়ে আমার ভাতিজা দেশে ফেরে। তবে গ্রামের কিছু অসাধু ব্যক্তির ইন্ধনে জাকারিয়ার বাবা আমাদের নামে মিথ্যা মামলা দেয়। মামলা মিমাংসার লক্ষ্যে গ্রাম্য প্রধানদের অংশগ্রনে এক শালিষে জাকারিয়ার বাবা ওবায়দুলকে আমার ভাই ৪ লাখ টাকা প্রদান করেন। আমাকে এই মামলায় সম্পুর্ণ মিথ্যা তথ্য উপস্থাপন করে ফাসানো হয়েছে, আমি সম্পুর্ণ নির্দোষ। গ্রেফতারের ভয়ে আমি পালিয়ে থাকায় বাদী পক্ষের লোকজন আমার দোকানে লুটপাট চালিয়ে কয়েক লক্ষ টাকার ক্ষতি করেছে।

শেয়ার করুন

নিউজটি শেয়ার করুন

স্বপ্নের ইটালি যেতে না পেরে নিঃস্ব হয়ে এখন অন্যের জমির শ্রমিক জাকারিয়া

আপডেট সময় : ০৪:২৯:৪০ অপরাহ্ন, রবিবার, ৩ ডিসেম্বর ২০২৩

 

মোঃ মাসুম হোসেন অন্তু, (সিরাজগঞ্জ) প্রতিনিধি: প্রতিবেশীর কথায় অনুপ্রাণিত হয়ে নিজের ভাগ্য উন্নয়ন ও পরিবারের স্বচ্ছলতা ফেরাতে ইতালি যাওয়ার স্বপ্নে বিভোর হয়ে কিছু জমি বন্ধক রেখে জাকারিয়া ইসলাম নামের এক যুবক ৯ লাখ টাকা তুলে দেন দালালের হাতে।
কিন্তু বিধিবাম ইতালি যাওয়ার স্বপ্ন আর পুরন হয়নি জাকারিয়া নামের সেই যুবকের, ফলশ্রুতিতে পর্যায়ক্রমে প্রায় সাড়ে ১৪ লাখ টাকা ফুরিয়ে লিবিয়া থেকে নিঃস্ব হয়ে দেশে ফিরে অন্যের জমিতে শ্রমিক হিসেবে বর্তমানে কাজ করছেন তিনি।
ঘটনাটি ঘটেছে সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলার মোহনপুর ইউনিয়নের নাদা গ্রামে। জাকারিয়া ইসলাম ওই গ্রামের মো. ওবায়দুল হোসেন দুলালের ছেলে। এই ঘটনায় জাকারিয়া ইসলামের বাবা দুলাল হোসেন বাদী হয়ে গত ২রা জানুয়ারি সিরাজগঞ্জ মানব পাচার দমন বিশেষ ট্রাইব্যুনালে আব্দুল মজিদ তার স্ত্রী হাসি খাতুন ও ছোটভাই বাদশা কে আসামি করে মামলা দায়ের করেন।
এই মামলার ১নং আসামি আব্দুল মজিদ বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন, তার স্ত্রী জামিনে মুক্ত ও ভাই গ্রেফতারের ভয়ে পালিয়ে রয়েছেন।
শনিবার (২রা ডিসেম্বর) দুপুরে সরেজমিনে উল্লাপাড়া উপজেলার মোহনপুর ইউনিয়নের নাদা গ্রামে একটি কৃষি জমিতে গিয়ে দেখা যায় বেশ কয়েকজন শ্রমিকের সাথে জাকারিয়া ইসলাম একটি সরিষা ক্ষেতে কাজ করছেন।
পরে তার সাথে কথা হলে জাকারিয়া ইসলাম জানান, প্রতিবেশী মৃত ছালাম প্রামাণিকের ছেলে আব্দুল মজিদ আমাকে ইতালি নিয়ে যাওয়ার আশ্বাস দিলে পরিবারের সাথে আলোচনা করে জমি বন্ধক রেখে ৯ লাখ টাকা তার হাতে তুলে দেই। গত বছরের মে মাসে আমাকে ও আব্দুল মজিদের ছেলেকে লিবিয়া পাঠানো হয়। সেখানে আড়াই মাস থাকার পর সমুদ্রপথে ইতালি যাওয়ার সময় কোস্টগার্ড আমাদের আটক করে।
জাকারিয়া ইসলামের মা পিঞ্জিরা খাতুন অভিযোগ করে বলেন, এরপর জেল থেকে মুক্তির জন্য প্রায় ৬৫ হাজার টাকা প্রদান করা হয় আব্দুল মজিদকে। পরে জেল থেকে মুক্ত হলে লিবায়ার দালাল জাকারিয়াকে মাফিয়াদের হাতে বিক্রি করে দেওয়া হয়। মাফিয়ারা জাকারিয়ার পরিবারের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের জন্য তাকে অমানুষিক নির্যাতন করে বাড়িতে বাবা মায়ের কাছে কল দিয়ে কথা বলায়।
এর মধ্যে বেশ কিছুদিন জাকারিয়াকে মাফিয়ারা অনাহারে রাখে ও মারধর করে। পরে মাফিয়াদের হাত থেকে ছেলের মুক্তির জন্য ২ দফায় প্রায় সাড়ে ৯ লাখ টাকা পাঠানো হয়। এজন্য তাদের গরু, ট্রলার ও ৪০ শতাংশ জমি বিক্রি করতে হয়। অর্থ দিয়ে ছাড়া পেয়ে লিবিয়া গমনের ৯ মাস পর গত ১৬ই ফেব্রুয়ারি জাকারিয়া দেশে ফেরে।
এই বিষয়ে অভিযুক্ত আব্দুর মজিদের বাড়িতে গেলে তার ছোট ভাই বাদশার স্ত্রী সাংবাদিকদের জানান, জাকারিয়া ও আমার ভাসুরের ছেলে হাসান একসাথে লিবিয়া গিয়েছিল তারা আবার ফিরেও এসেছে। তবে আমার স্বামীর এই ঘটনার সাথে কোন সম্পর্ক নেই, তাকে উদ্যোশ্যমূলক ভাবে মামলার আসামি করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, তার স্বামী বাদশা একজন অসুস্থ্য মানুষ তার ওপেন হার্ট সার্জারি করা। মিথ্যা মামলায় গ্রেফতারের ভয়ে সে পালিয়ে রয়েছে এরকম চলতে থাকলে তার স্বাস্থ্যের আরও অবনতি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এই বিষয়ে জাকারিয়া ও আব্দুল মজিদের প্রতিবেশীরা জানান, আব্দুল মজিদ ইতিপূর্বেও আমাদের গ্রামের ৮/১০ জনকে এভাবেই ইতালি পাঠিয়েছেন। তার যদি অসৎ কোন উদ্যেশ্য থাকতো তাহলে জাকারিয়ার সাথে তার ছেলে হাসানকে পাঠাতেন না।
তারা আরও বলেন, মজিদের ভাই বাদশা অত্যন্ত ভালো প্রকৃতির একজন মানুষ। তিনি গ্রামেই মুদিখানার দোকান করেন, তাকে মিথ্যা ভাবে মামলায় জড়ানো হয়েছে।
এই বিষয়ে মুল অভিযুক্ত আব্দুল মজিদের ছোটভাই বাদশা বলেন, আমার ভাতিজা ও জাকারিয়ার লিবিয়া হয়ে ইতালি যাওয়ার জন্য তাদের উভয়ের পিতা উল্লাপাড়া ও ঢাকায় গিয়ে দালাল আজিজের মাধ্যমে একাউন্টে টাকা প্রদান করে। লিবিয়া গিয়ে তারা তারা দু্জনই মাফিয়াদের হাতে আটক হয়, এসময় মুক্তিপন হিসেবে আমার ভাই ও জাকারিয়ার বাবা ওবায়দুল মাফিয়াদের দেওয়া একাউন্টে আবারও টাকা দেয়।
গত ১৬ই ফেব্রুয়ারি জাকারিয়া দেশে ফেরে ৫মাস পর মাফিয়াদের হাত থেকে মুক্তি পেয়ে আমার ভাতিজা দেশে ফেরে। তবে গ্রামের কিছু অসাধু ব্যক্তির ইন্ধনে জাকারিয়ার বাবা আমাদের নামে মিথ্যা মামলা দেয়। মামলা মিমাংসার লক্ষ্যে গ্রাম্য প্রধানদের অংশগ্রনে এক শালিষে জাকারিয়ার বাবা ওবায়দুলকে আমার ভাই ৪ লাখ টাকা প্রদান করেন। আমাকে এই মামলায় সম্পুর্ণ মিথ্যা তথ্য উপস্থাপন করে ফাসানো হয়েছে, আমি সম্পুর্ণ নির্দোষ। গ্রেফতারের ভয়ে আমি পালিয়ে থাকায় বাদী পক্ষের লোকজন আমার দোকানে লুটপাট চালিয়ে কয়েক লক্ষ টাকার ক্ষতি করেছে।

শেয়ার করুন